চীন থেকে ঋণ নেয়া শীর্ষ ২০ দেশের অর্ধেকের বেশি আফ্রিকার

বিশ্বের শীর্ষ ঋণদাতার দেশের অন্যতম চীন। বিশেষ করে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) প্রকল্পের অধীনে বিশ্বজুড়ে এশিয়ার দেশটির ঋণসহায়তা কার্যক্রম গত দশকে বেশ সম্প্রসারণ রয়েছে।

বিশ্বের শীর্ষ ঋণদাতার দেশের অন্যতম চীন। বিশেষ করে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) প্রকল্পের অধীনে বিশ্বজুড়ে এশিয়ার দেশটির ঋণসহায়তা কার্যক্রম গত দশকে বেশ সম্প্রসারণ রয়েছে। এতে বড় একটি হিস্যা রয়েছে আফ্রিকার দেশগুলোর। সাম্প্রতিক এক পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, চীন থেকে ঋণ নেয়ার ক্ষেত্রে শীর্ষ ২০ দেশের মধ্যে ১১টিই আফ্রিকার। কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, অবকাঠামোগতভাবে পিছিয়ে থাকা অঞ্চলটি ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে বিআরএর অধীনে একের পর এক উন্নয়ন প্রকল্পে যুক্ত হয়েছে। খবর আনাদোলু।

২০১৩ সালে ঘোষিত বিআরএর লক্ষ্য হলো চীন থেকে শুরু করে এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকা পর্যন্ত বিস্তৃত অবকাঠামোগত নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা। এ প্রকল্পের আওতায় রেলপথ, মহাসড়ক, বিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ বিভিন্ন ধরনের বৃহৎ উন্নয়নমূলক কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত।

বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়েছে উঠেছে আফ্রিকার দেশগুলো। এ উদ্যোগের আওতায় তারা চীনের এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংক এবং চায়না ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের মাধ্যমে সহজেই বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ঋণ নিতে পারছে। তবে এসব ঋণ নিয়ে বিশ্লেষক ও বিভিন্ন ফোরামে বিতর্ক রয়েছে। অনেকেই একাধিকবার সতর্ক করে বলেছেন, এর মধ্য দিয়ে দেশগুলো এক ধরনের ‘ঋণ ফাঁদে’ পড়তে যাচ্ছে।

বিতর্ক তৈরির প্রধান কারণ হলো প্রকল্পগুলোর স্বচ্ছতার ঘাটতি ও কতটা টেকসই তা নিয়ে সংশয়। এছাড়া অনেক বিশেষজ্ঞ উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যে ভবিষ্যতে কিছু আফ্রিকান দেশ ঋণের বোঝা সামলাতে গিয়ে তাদের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সম্পদ চীনের কাছে হস্তান্তর করতে বাধ্য হতে পারে।

২০২৩ সালে বিশ্বব্যাংকের দেয়া তথ্যানুযায়ী, তালিকায় থাকা ১১টি আফ্রিকান দেশের মধ্যে চীন থেকে সবচেয়ে বেশি ঋণ নিয়েছে অ্যাঙ্গোলা। তখন ঋণের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৭৮০ কোটি ডলার।

চীনের অর্থায়নে অ্যাঙ্গোলায় পরিচালিত প্রকল্পের মধ্যে সবচেয়ে বৃহৎ নতুন শহর কিলাম্বা। এখানে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার মানুষের জন্য তৈরি হয়েছে ২০ হাজার ফ্ল্যাট, স্কুল, পানি পরিশোধন ও বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রসহ ৭০০টি ভবনবিশিষ্ট আবাসিক শহর। অন্যান্য প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে ২ হাজার ১৭২ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন কাকুলো-কাবাসা জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, কাপক্যারি পাওয়ার ট্রান্সমিশন প্রকল্প, লুয়ান্ডা–মালাঞ্জে রেলপথ, লোবিতো–লুয়াউ রেল, সোয়ো তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং পানি ও কৃষি অবকাঠামো।

চীন থেকে ঋণ নেয়ার ক্ষেত্রে আফ্রিকার অ্যাঙ্গোলার পরে রয়েছে ইথিওপিয়া ৬৫০ কোটি, মিসর ৬৩০, জাম্বিয়া ও কেনিয়া ৬০০, দক্ষিণ আফ্রিকা ও ক্যামেরুন ৩৫০, রিপাবলিক অব কঙ্গো ৩২০ ও ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো ২৯০ কোটি ডলার।

তবে সর্বোচ্চ ঋণদাতার দেশটি আফ্রিকার বাইরে। এটি হলো অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত এশিয়ার দেশ পাকিস্তান, ২০২৩ সাল নাগাদ তাদের ঋণের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ২৫০ কোটি ডলার। তালিকায় আফ্রিকার বাইরে অন্যান্য দেশের মধ্যে চীন থেকে আর্জেন্টিনা ২ হাজার ১২০ কোটি, শ্রীলংকা ৮৬০, বাংলাদেশ ৬৭০, লাওস ৬০০, কম্বোডিয়া ৪০০, বেলারুশ ৩৫০, একুয়েডর ৩৩০ এবং ব্রাজিল ৩০০ কোটি ডলার ঋণ নিয়েছে।

আফ্রিকার দেশগুলোর অর্থনীতির আকার তুলনামূলক ছোট। এছাড়া প্রয়োজনীয় ঋণ সরবরাহের উৎস কম হওয়ায় বিশ্লেষকদের অনেকেই বলছেন, আফ্রিকার চাহিদা পূরণে সবচেয়ে উপযুক্ত দেশ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে চীন।

ইস্তানবুলভিত্তিক কক ইউনিভার্সিটির প্রভাষক আলতাই আতলি জানান, বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের আওতায় পরিচালিত প্রকল্পে অর্থায়ন করে একটি চীনা ব্যাংক, আর বাস্তবায়ন করে একটি চীনা কোম্পানি। অর্থাৎ, এ কার্যক্রমের নেতৃত্বে থাকে চীনা রাষ্ট্র নিজেই। তিনি বলেন, ‘এখানে আমরা একটি রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদের কথা বলছি: এগুলোকে শুধু বেসরকারি কোম্পানি বা ব্যাংক হিসেবে দেখা যাবে না, বরং এটি চীনের পররাষ্ট্রনীতির একটি অংশ।’

চীন থেকে ঋণ প্রাপ্তিতে বাড়তি কোনো শর্ত থাকে না বলেও জানান আলতাই আতলি। তিনি বলেন, ‘অবকাঠামোগত উন্নয়নে সহযোগী হিসেবে সবচেয়ে উপযুক্ত দেশ হিসেবে উঠে এসেছে চীন। তারা দ্রুত কাজ সম্পন্ন করতে পারে, তুলনামূলকভাবে সহজ শর্তে ঋণ দেয়। পশ্চিমা দেশগুলোর মতো রাজনৈতিক শর্ত বা অতিরিক্ত কোনো শর্ত চাপিয়ে দেয় না।’

আবার সতর্ক করে তিনি এও জানান, কোনো চীনা কোম্পানি শুধু মুনাফার আশায় ওই অঞ্চলে বিনিয়োগ করে না। এর মাধ্যমে চীন তার রাজনৈতিক ও কৌশলগত প্রভাব বিস্তার করতে চায়। আলতাই আতলি বলেন, ‘এসব কার্যক্রম চীনের রাষ্ট্রীয় নীতির অধীনে পরিচালিত হয়। আমরা যা দেখছি, তা হলো চীন এ অঞ্চলে ব্যবসা করছে এবং স্বাভাবিকভাবেই তারা তাদের অর্থ ফেরত চায়। এ কারণেই আমরা “ঋণ ফাঁদ” শব্দটি সমর্থন করি না।’

আলতাই আতলির মতে, ‘ঋণ ফাঁদ’ শব্দটি অনেক সময় অতিরঞ্জিত। কারণ অনেক দেশ চীনের ঋণ পরিশোধে সমস্যায় পড়লেও সেটা শুধু এক দেশ থেকে নেয়া ঋণের কারণেই নয়। তারা অন্যান্য দেশের কাছ থেকেও ঋণ নিয়েছে, তাই শুধু চীনকে দোষারোপ করাটা সঠিক নয়।

তবে চীনের অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্প নিয়ে স্বচ্ছতার অভাব ও টেকসই না হওয়ার অভিযোগ নিয়ে কিছুটা একমত আতলি। তার মতে, চীন প্রকল্প অর্থায়নে আন্তর্জাতিক স্বচ্ছতার মানদণ্ড মেনে চলে না। এসব প্রকল্পের শর্ত, খরচ ও ঝুঁকি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয় না। এদিক থেকে আফ্রিকার দেশগুলোর জন্য চীনের ঋণ দীর্ঘমেয়াদে কতটা লাভজনক, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে আলতাই আতলির।

আরও